অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
কয়েক দিনের নেতিবাচক প্রবণতা কাটিয়ে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। গতকাল লেনদেনের শেষদিকে এসে বাজার আচরণের এ পরিবর্তন ঘটে। এর আগে সকাল থেকে বেশ ক’বার বিক্রয়চাপের মুখে বাজারগুলো গতি হারানোর পাশাপাশি সূচকের অস্থির আচরণের মধ্যে ছিল। তবে বেলা সাড়ে ১২টার পর পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে থাকে। লেনদেনের শেষমুহূর্তে এসে দুই বাজারেই সবগুলো সূচকের উন্নতি দিয়েই লেনদেন শেষ করে দুই পুঁজিবাজার।
গতকাল সকালে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি দিয়েই লেনদেন শুরু করে দুই পুঁজিবাজার। ঢাকায় প্রধান সূচকটি মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে ৩৬ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। কিন্তু এর পরই বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে নিম্নমুখী হয়ে ওঠে সূচক। বেলা ১টার আগে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের বড় অংশই হারিয়ে ফেলে বাজারটি। কিন্তু বেলা ১১টার দিকে ফের ঊর্ধ্বমুখী হয় সূচক। বেলা সোয়া ১১টায় সূচকটি আবার আগের অবস্থানে পৌঁছলেও বেশিক্ষণ টেকেনি। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে ডিএসই সূচক নেমে আসে ৫ হাজার ৮২৩ পয়েন্টে। গতকাল সূচকের এ অবস্থান থেকেই শুরু করে ডিএসই। লেনদেনের শেষ মুহূর্তে এসে এখান থেকেই নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সূচক দিনশেষে উন্নতি ধরে রাখে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২২ দশমিক ৫৫ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ৫ হাজার ৮২২ দশমিক ৩১ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার লেনদেন শেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৮৪৪ দশমিক ৮৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫৬ ও দশমিক ৬০ পয়েন্ট। দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ২৪ দশমিক ১৪ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয় গতকাল। ১৫ হাজার ৬১৮ দশমিক ২২ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচকটি গতকাল দিনশেষে স্থির হয় ১৫ হাজার ৬৪২ দশমিক ৩৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১২ দশমিক ৭৪ ও ১৭ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট।
লেনদেনের শুরু থেকে বিক্রয়চাপে বাজার গতি হারায় হতকাল। শেষদিকে এসে সূচকের উন্নতি ঘটলেও লেনদেন অনেকটা গতিহীনই ছিল। ফলে ডিএসইর লেনদেনের অবনতি ঘটে। বাজারটি গতকাল ৯০৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিনের চেয়ে ৫৬ কোটি টাকা কম। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৯৬৪ কোটি টাকা। তবে লেনদেনের সামান্য উন্নতি ঘটে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। বাজারটির গতকাল ৩৫ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে। রোববার সিএসইর লেনদেন ছিল ৩১ কোটি টাকা।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কয়েক দিন টানা সংশোধনের পর গতকাল সকালেও বাজারে বিক্রয়চাপ সক্রিয় ছিল। এ সময় বেশ কিছু কোম্পানি থেকে মুনাফা তুলে নেন বিনিয়োগকারীরা। কিন্তু শেষদিকে এসে বিনিয়োগকারীদের ক্রয়াদেশ বৃদ্ধি পেলে বাজার পরিস্থিতির ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে। সকাল থেকে যেসব কোম্পানি দর হারায় শেষদিকে তার প্রায় সবটাই ফিরে পায়। দিনের বাজার আচরণকে তাই তারা বাজারের নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত হিসাবেই দেখছেন। তারা মনে করেন আজ থেকে বাজার আবার তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে।
একই ধারণা বিনিয়োগকারীদেরও। গতকাল ডিএসইর বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরে বিনিয়োগকারীদের সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে তারা জানান সামনের দিনগুলোতে আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠবে বাজার। গত কয়েক দিন লেনদেন ও সূচকের অবনতিকে তারা মনস্তাত্বিক বলেই মনে করছেন। তাদের মতে, এ ক’দিন বাজারে যথেষ্ট সংশোধন ঘটায় বাজারের মূল্যস্তর এ মুহূর্তে অনেক কমে গেছে। এখান থেকে বাজারে বিনিয়োগকারীরা আবার নিজেদের অবস্থান নেবেন। ফলে সূচকের পাশাপাশি লেনদেনেরও উন্নতি ঘটবে বলেই প্রত্যাশা তাদের।
এ দিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত তিনটি ব্যাক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, ফাস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড। দিনের শুৃরু থেকে কোম্পানিগুলোর লেনদেন চললেও মাঝখানে হঠাৎ করে উল্লিখিত কোম্পানি তিনটির লেনদেন বন্ধ ঘোষণা করে ডিএসই।
পরবর্তীতে এর ব্যাখ্যায় ডিএসই জানায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠান তিনটির শেয়ার লেনদেন বন্ধ করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেয়া পর্যন্ত এ স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে। জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক রেজুলিউশন আইন, ২০২৬ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান তিনটিকে ‘অকার্যকর’ ঘোষণা করেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে তাদের শেয়ার লেনদেন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
এর আগে বিভিন্ন অনিয়ম, জালিয়াতির অভিযোগ এবং দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার কারণে প্রতিষ্ঠান তিনটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অবসায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তিনটি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসকও নিয়োগ দেয়া হয়। প্রতিষ্ঠানভেদে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক পর্যায়ের তিন কর্মকর্তাকে প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল বেক্সিমকো লিমিটেড। ৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ২ কোটি ৪ লাখ ২৬ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৯ কোটি ৬ লাখ টাকায় ১ কোটি ৫৪ লাখ ৯৯ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল এমএল ডাইং। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ব্র্যাক ব্যাংক, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, সায়হাম টেক্সটাইলস, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, প্রাইম ইন্স্যুরেন্স, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস ও সিটি ব্যাংক।