বুকার পুরস্কারজয়ী প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও বিশ্লেষক অরুন্ধতী রায় গত ৩ আগস্ট দিল্লির ইন্টারন্যাশনার সেন্টারে নিজের বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে কিছু কথা বলেছেন, যা ভেবে দেখার মতো। নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন প্রসঙ্গে অরুন্ধতী রায় বলেন, মাত্র দুই সপ্তাহের তীব্র আন্দোলনের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন শিক্ষামন্ত্রী। সিজেপির এই আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা জনসমর্থন ও ভাবমূর্তিকে বেশ জোরেশোরে নাড়িয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছেন মোদি। এ রাজনৈতিক অভিঘাত যে কোনো নির্বাচনি জয়ের চেয়েও বড়। উল্লেখ্য, অরুন্ধতী রায়ের ‘মাদার মেরি কামস টু মি’-এর হিন্দি অনুবাদ ‘মেরি মা, মেরি গ্যাংস্টার’-এর প্রকাশনা ঘিরে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সময় অরুন্ধতী রায় বলেন, ‘রাজনীতিতে নির্বাচনই সবকিছু নয়; কখনো কখনো জনতার আন্দোলন বহুবছর ধরে নির্মিত রাজনৈতিক বয়ান ও ভাবমূর্তিকেও অল্প সময়ের মধ্যে নাড়িয়ে দিতে পারে।’ এমন উদাহরণ আমরা লক্ষ্য করেছি বাংলাদেশের পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও।

প্রকাশনা অনুষ্ঠানে অরুন্ধতী রায় বলেন, প্রধানমন্ত্রী মোদির ২৪ বছরের যে ভাবমূর্তি, যা তিনি কোটি কোটি রুপি ব্যয় করে তৈরি করেছিলেন, এমনকি কেউ কেউ তাকে বিষ্ণুর অবতার বলেও প্রচার করতে শুরু করেছিলেন। তার সেই ইমেজ মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে নাড়িয়ে দেয় তরুণদের বিক্ষোভ। তেলাপোকার দল সেই পুরো ২৪ বছরকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এক অর্থে এটি ককরোচদের নির্বাচনি জয়ের চেয়েও বড় বিজয়। ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’-এর বুকারজয়ী এই লেখিকা সতর্ক করে বলেন, সরকার যদি প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতার চাবিকাঠিগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে, তাহলে এ চ্যালেঞ্জ এখনো শেষ হয়নি। সরকার যদি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা ক্ষমতার চাবিকাঠিগুলো নিজেদের কাছে রাখে, তাহলে গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর জন্য সামেন আরো কঠিন সময় অপেক্ষা করছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করতে বিরোধী দল ও সুশীল সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভকারীদের কাছ থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। প্রশংসা করেন আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের পরিপক্কতার। বলেন, মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও তারা অত্যন্ত দায়িত্বশীল আচরণ করেছেন।

সঙ্গীতের সঙ্গে তুলনা করে ৬৪ বছর বয়সি এই বিশ্লেষক বলেন, বেস গিটারিস্ট গায়ক হতে পারেন না, গায়ক ড্রামার হতে পারেন না, ড্রামার গিটারিস্ট হতে পারেন না। তাদের প্রত্যেকেরই ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা ছিল। দলের প্রত্যেকেরই স্বতন্ত্র ভূমিকা ছিল কিন্তু তাদের লক্ষ্য ছিল অভিন্ন। এখন প্রাপ্ত বয়স্কদেরও সেই পরিপক্কতা দেখাতে হবে। বক্তব্যের শেষে অরুন্ধতী রায় বলেন, ‘অন্যায়কে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার সময় শেষ। এখন নাগরিকদেরই প্রমাণ করতে হবে, তারা আর নির্যাতন মেনে নেবে না।’ মেনে না নেওয়ার এই যে আহ্বান, তা কিন্তু কোনো সহজ বিষয় নয়। কারণ এর সাথে যুক্ত হয়ে যায় অভ্যুত্থান বা বিপ্লব, যা প্রতিরোধের জন্য সব দেশের সরকারই প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার চাবিকাঠিগুলোর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব বজায় রাখতে চায়। ফলে আন্দোলনকারীদের সাথে সরকারের সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। কখনো তা রূপ নেয় অভ্যুত্থানে, কখনো বা বিপ্লবে। বিষয়টি নির্ভর করে আন্দোলনকারীদের যোগ্যতা, পরিপক্কতা, সাংগঠনিক শৃংখলা ও সৃজনশীলতার ওপর। এখানে পেশাজীবীদের এবং জনগণের সামগ্িরক অংশগ্রহণের মাত্রাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।